madany
ইসলামী অঙ্গনে একটি সুপরিচিত নাম মাওলানা রফিকুল ইসলাম মাদানী। তিনি একজন বিজ্ঞ হাক্কানী আলেম, ইসলামী স্কলার, লেখক, গবেষক ও সংগঠক। বাংলাদেশে অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসার প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষক। রাজনীতির পাশাপাশি সোচ্চার রয়েছেন সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমে। কাজ করছেন ইমামদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষা নিয়েও। বর্তমানে তিনি থাকেন সৌদি আরবের মদীনা মোনাওয়ারায়। আর্ন্তজাতিক সেবা ও দাওয়াতি সংগঠন নদওয়াতুল উলামা আল-আলামিয়্যার বর্তমানে তিনি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি তিনি এসেছিলেন বাংলাদেশে। এসময় তার মুখোমুখি হয়েছিলেন সাংবাদিক আশিক মাহমুদ। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন তাঁর সঙ্গে। সেসব কথা পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো:
আশিক মাহমুদ: বিশ্বের নানান দেশে জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করছে এটাকে আপনি কিভাবে মুল্যায়ন করবেন?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ নতুন কোন বিষয় নয়। ক্ষমতা দখল, সম্পদ দখল ও প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারের উদ্দেশ্যে সা¤্রাজ্যবাদপুষ্ট উগ্র সন্ত্রাসী তৎপরতা সেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। বলা যায়, আজকের আধুনিক বিশ্বে এটা ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে। সা¤্রাজ্যবাদ নিজেদের স্বার্থে কখনো আইএস, আল-কায়েদা, কখনো তালেবান কিংবা কখনো জেএমবি নামে জঙ্গি বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠি সৃষ্টি করে। আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে নির্মূলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে তাই চলছে।
আশিক মাহমুদ: যারা এসব করছে তারা বলছে ইসলাম কায়েম করতেই তাদের এই প্রচেষ্টা, ইসলাম কি এই পথ সমর্থন করে?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: পৃথিবীতে ইসলামই হলো একমাত্র জীবন ব্যবস্থা, যে জীবন ব্যবস্থায় অসহনশীলতা, অসহিষ্ণুতা, গোড়ামী, সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। আর জঙ্গিবাদ কিংবা সন্ত্রাসবাদকে সমর্থনের তো কোন অপশনই ইসলামে নেই। ইসলাম অর্থ শান্তি। যে কাজে মানুষের শান্তি বিনষ্ট হয়, নিরপরাধ মানুষের প্রাণ হরণ করা হয়, সেটাকে ইসলাম সমর্থন করে না।অন্যদিকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কিয়ামতের দিনে মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিচার করা হবে, তা হবে তাদের মধ্যে সংঘটিত রক্তপাত ও হত্যার বিচার। (বোখারী, মুসলিম) তাই জঙ্গিবাদকে জঙ্গিবাদ হিসেবেই দেখতে হবে। ইসলামের সাথে এটা জুড়ে দেওয়া দেওয়া উচিত নয়।
আশিক মাহমুদ: যদি ইসলাম জঙ্গিবাদ সমর্থন না করে তবে যারা করছে তাদের ব্যাপারে ইসলামের বিধান কি ? বা তাদের শাস্তি কি ইসলামি শরিয়া আইনে?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: ইসলাম কায়েম করার ধুয়া তুলে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের শিখানো পদ্ধতি পরিহার করে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের মাধ্যমে যারা পৃথিবীতে দাঙ্গা, অশান্তি, জনমনে ভীতি, আতঙ্ক ও বিপর্যয় সৃষ্টি করছে, তাদের সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বর্ণিত ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশ হচ্ছে- ‘যারা আল্লাহ তা’য়ালা ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং আল্লাহর যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টির অপচেষ্টা করে, তাদের জন্যে নির্দিষ্ট শাস্তি হচ্ছে এই যে, তাদের হত্যা করা হবে কিংবা তাদের শূলবিদ্ধ করা হবে, অথবা বিপরীত দিক থেকে তাদের হাত-পা কেটে ফেলা হবে, কিংবা দেশ থেকে তাদের নির্বাসিত করা হবে; এই অপমানজনক শাস্তি তাদের দুনিয়ার জীবনের জন্যে।
আশিক মাহমুদ: তাহলে জঙ্গিবাদ রুখতে কি করনীয় বলে আপনি মনে করেন ?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: জঙ্গিবাদকে চিরতরে নির্মূল করতে হবে এবং তার জন্য সরকারকে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে সর্বদলীয় কমিটি গঠন করতে হবে এবং সবার মতামতের ভিত্তিতে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে। তবে এ নিয়ে অতিমাত্রায় কথা না বলাই ভালো। কারণ এতে সবদিক দিয়ে আমাদেরই ক্ষতি। তখন শক্তিশালী শত্র“কে মোকাবিলা করাটা কঠিন হতে পারে। আর নিজেদের সমস্যার কথা বেশি বেশি না বলে সমস্যাটা সমাধানের জন্য কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করাটাই উত্তম। এতেই দেশ ও জাতির কল্যাণ। বাংলাদেশকে জঙ্গিকবলিত দেশ নয় বরং গণতান্ত্রিক ও শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবেই বিশ্ব দরবারে পরিচিত করতে হবে। তাহলে আমাদের রক্তে কেনা স্বাধীনতা অর্থবহ হবে।
আশিক মাহমুদ: আলেম ওলামাদের কি কোন দায় আছে, অর্থাৎ আলেমরা কি ব্যর্থ, তারা সঠিক ইসলামের বানী মানুষের কাছে দিতে পারেনি ?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: আলেম-উলামাগণ নবী করীম (সা.)এর ওয়ারিস। দ্বীনের দায়ি। ১৪শত বছর আগে থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত হাক্কানী উলামায়ে কেরাম সমাজে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় লক্ষ্যে কুরআন ও হাদীসের মর্ম বাণী মানুষের কাছে পৌছে দিচ্ছেন। সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, ফেৎনা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সরব ভূমিকা পালন করছেন। কাজেই তারা ব্যর্থ হবে কেন? ব্যর্থ তো তারাই যারা নিজেদের দোষ- ত্র“টি আড়াল করে ব্যর্থতার গ্লানি আলেমদের উপর চাপিয়ে দিয়ে সমাজে হিরো বনতে চায়। বাহবা কুড়াতে ব্যস্ত।

আশিক মাহমুদ: কওমী মাদরাসার বিরুদ্ধে কথা উঠছে সেখানে জঙ্গিবাদের চর্চা হয়, আপনি কি মনে করেন আসলেই হয় ?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: কওমী মাদরাসা আদর্শবান, পরহেজগার সুনাগরিক তৈরি করে। সেখানে জঙ্গি, জঙ্গিবাদিতা, জঙ্গিবাদিতার মদদ দান ইত্যাদির লেশ মাত্রও নেই আর কোনো কালে ছিলও না। বরং কওমী শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে অন্যায়ভাবে কোনো মানুষ কেন কোনো পশু বা জীবজন্তুকেও হত্যা করা বা কষ্ট দেওয়া হারাম মর্মেই শিক্ষা দেওয়া হয়। কওমী মাদরাসার শিক্ষক, যারা ছাত্রদেরকে মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে খালকে খোদার প্রতি দরদ ও মমত্ববোধ পোষণের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, শেষ রাতে উঠে ছাত্র শিক্ষক নিরবে তাহাজ্জুদ, যিকর, মুরাকাবা, দুআ, রোনাজারী করে আল্লাহর কাছে চোখের পানি ছেড়ে নিজের জন্য, দেশের জন্য ও সমস্ত উম্মতের জন্য সার্বিক কল্যাণ ও কামিয়াবীর দুআ করছেন, তাদেরকে যখন সন্ত্রাসী বা জঙ্গি বলে গালি দেওয়া হয় কিংবা কৌশলে অপকৌশলে জঙ্গি (?) প্রমাণ করে দেখানোর চেষ্টা করা হয় তখন মনে রাখবেন, এটা অন্যায়, অবিচার। এই জুলুম আল্লাহ পাক সহ্য করবেন না। তাই কওমী মাদরাসা সম্পর্কে কথা বলার সময় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের আরো সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ।
আশিক মাহমুদ: তবে মাদরাসার নামে এই প্রচার কেন হচ্ছে বলে আপনি মনে করছেন, আর এই ভুল ধারনা দূর করতে করনীয় কি ?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: পাশ্চাত্যের প্রেসক্রিপশনে ইসলাম বিরোধী উগ্র নাস্তিক্যবাদী শক্তি এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা চায় না এদেশে ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা টিকে থাকুক। আপনারাও দেখেছেন এদেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র আছে অযুহাত দেখিয়ে বিভিন্ন কওমী মাদরাসায় তল্লাশী চালিয়েছে। কোথাও কি অস্ত্র পেয়েছে? পায়নি। হ্যাঁ, দু’ একটা মাদরাসায় কুরবানীর ছুরি জব্দ করে মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করেছে। এদেশের শীর্ষ আলেমগণ বার বার তাদের বক্তৃতা, বিবৃতির মাধ্যমে বলে আসছেন কওমী মাদরাসা আদর্শ মানব তৈরির কারখানা। সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদকে তারা ঘৃণা করে। বিগত কিছুদিন আগে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেছেন, ‘কওমি মাদরাসায় কোনো জঙ্গি তৈরি হয় না। কওমি মাদরাসাকে যারা জঙ্গিপ্রজনন কেন্দ্র বলেন, তারা ভুল বলেন। তা ঠিক নয়’। এরপরও যদি কারো ভুল না ভাঙ্গে। তাহলে বুঝতে হবে সে ব্যক্তি হয় ইসলামের শত্র“দের মিত্র নয়তো জ্ঞানপাপী।
আশিক মাহমুদ: ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ হচ্ছে, এক্ষেত্রে আলেমদের কি করা উচিত?
মাও: রফিকুল ইসলাম মাদানী: আপনাকে বুঝতে হবে। জঙ্গিবাদ আর ইসলাম দু’টো ভিন্ন জিনিস। ইসলামী জঙ্গিবাদ এটা পাশ্চাত্য মিডিয়ার একটা আওড়ানো বুলি ছাড়া কিছু নয়। তারপরও যেহেতু ইসলামের নাম নিয়ে কতিপয় ভ্রান্ত গ্রপ্ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাচ্ছে। তাই তাদের হাত থেকে দেশ, জাতি ও ইসলামকে রক্ষা করা সকল আলেমদের জন্য আবশ্যক। কাজেই আলেম-উলামা, ইমাম, খতিব, মাদরাসা শিক্ষা যারা ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত রয়েছেন। স্ব স্ব অবস্থানে থেকে খুৎবা, বয়ানে জঙ্গিবাদ যে সমাজের জন্য একটা ক্যানসার। ইসলামে এর কোন স্থান নেই। কুরআন-হাদীসের বরাতে এটা জনসম্মুখে তুলে ধরতে হবে। এর কুফল সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। ছোটÑখাট মতভেদ ভুলে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে, সম্ভব হলে উপজেলা পর্যায়ে সেমিনার, সেম্পোজিয়ামেরও আয়োজন করা যেতে পারে। আশা করি, বেশ সুফল পাওয়া যাবে। জনগণ ইসলাম ও জঙ্গিবাদের পার্থক্য নির্ণয়ে সঠিক ধারণা লাভ করবেন।

LEAVE A REPLY