ঢাকা, ১১ অক্টোবর, ২০১৮। মা ও জাটকা ইলিশ নিধন বন্ধে নদীতে তিন মাস মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতি জেলে পরিবারকে মাসে ৮ হাজার টাকা করে সরকারি অনুদানের দাবি জানিয়েছে ২৪টি উপকূলীয় মৎস্যজীবী শ্রমিক ও কৃষক সংগঠন। আজ জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনীতিতে জেলেদের অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতিরও দাবি তুলে ধরেন।

“জাতীয় অর্থনীতিতে জেলেদের অবদানের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি চাই: মাছ ধরা নিষিদ্ধকালীন সময়ে মৎসজীবীদের জন্য বিশেষ সহায়তা এবং বিদ্যমান রেশন সুবিধার আওতা বৃদ্ধি করুন” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনটি যৌথভাবে আয়োজন করে অনলাইন নলেজ সোসাইটি, অর্পণ, অন্তর, উদয়ন বাংলাদেশ, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন, এসডিও, কোস্ট ট্রাস্ট, জাতীয় কৃষাণী শ্রমিক সমিতি, জাতীয় শ্রমিক জোট, ডাক দিয়ে যাই, ডোক্যাপ, দ্বীপ উন্নয়ন সংস্থা, পিরোজপুর গণ উন্নয়ন সমিতি, প্রান্তজন, পিএসআই, কৃষক ফেডারেশন, বাংলাদেশ ভূমিহীন সমিতি, বাংলাদেশ কৃষি ফার্ম শ্রমিক ফেডারেশন, লেবার রিসোর্স সেন্টার, সংকল্প ট্রাস্ট, সংগ্রাম, সিডিপি, হাওর কৃষক ও মৎস্য শ্রমিক জোট এবং বাংলাদেশ ফিশ ওয়ার্কার এলায়েন্স।

কোস্ট ট্রাস্টের পরিচালক, সনত কুমার ভৌমিকের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আয়োজকদের পক্ষ থেকে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন কোস্ট ট্রাস্টের গবেষক মো. মজিবুল হক মনির। এতে আরও বক্তব্য রাখেন উপকূলীয় মৎস শ্রমিক সমিতির প্রতিনিধি রাশেদা বেগম, কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাহাদুর, বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশনের সভাপতি বদরুল আলম এবং কোস্ট ট্রাস্টের সহকারী পরিচালক মোস্তফা কামাল আকন্দ।

মো. মজিবুল হক মনির উল্লেখ করেন, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৫ লাখ জেলে প্রত্যক্ষভাবে ইলিশ ধরার কাজে নিযুক্ত। ইলিশ সংরক্ষণ ও পরিবহনসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত আছে আছে প্রায় ২০-২৫ লাখ মানুষ। দেশের মোট মৎস উৎপাদনের প্রায় ১২% আসে ইলিশ থেকে, যার বাজার মূল্য প্রায় ৮ হাজার ১২৫ কোটি টাকা। গড়ে একজন জেলে বছরে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকার ইলিশ মাছ ধরেন। মাছ ধরা বন্ধের সময় (গড়ে বছরে ৩ মাস) একজন জেলে গড়ে ৩০ কেজি করে মোট ৯০ কেজি চাল পান, যার বাজার মূল্য প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকা এবং এতে করে সরকারের এ খাতে মোট খরচ হয় আনুমানিক ১৮০ কোটি টাকা। সম্প্রতি দেশের সর্বনি¤œ মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার টাকা, সেই হিসাবে প্রত্যেক জেলে পরিবারকে তিন মাসের জন্য (যখন মাছ ধরা বন্ধ থাকে) ৮ হাজার টাকা করে মোট ২৪ হাজার টাকা অনুদান দিলেও বছরে খরচ হবে মাত্র ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সরকার ইচ্ছে করলে সহজেই এই অর্থ প্রদান করতে পারে।

সনত কুমার ভৌমিক বলেন, জেলেদের জন্য পরিচয়পত্র প্রদান করা হলেও, ৪০% পরিচয়পত্র পেয়েছে জেলে নয় এমন ব্যক্তিবর্গ। ইলিশ প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলে প্রতি জেলে পরিবার মাসে ৪০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রেই তারা ২৫%-৩০% চাল কম পাচ্ছেন। এই অবস্থার অবসানে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মিজানুর রহমান বাহাদুর বলেন, কক্সবাজার উপজেলা সদরে প্রায় ৬ হাজার জেলে আছেন, এর মধ্যে নিবন্ধিত আছেন প্রায় ২ হাজার ৫০০, কিন্তু এখন পর্যন্ত এক জনও মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালীন সময়ে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া সরকারের রেশন বা ভিজিএফ সুবিধা পায়নি। রাশেদা বেগম বলেন, সরকার জেলে সম্প্রদায়ের জন্য যেসব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছেন তা যথাযথভাবে তারা পাচ্ছেন কিনা তা দেখার জন্য উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে যাচাই করে দেখার জন্য বিশেষ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় জেলেদের কাছে বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দেওযার জন্য কমিউনিটি রেডি প্রতিষ্ঠায় সরকারের পৃৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। বদরুল আলম বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্মের কারণে সাধারণ জেলেরা ন্যায্যমূল্যের ৩০-৩৫% কম দামে তাদের মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, আমাদের প্রতিটি উপজেলায় মৎস্য অফিস আছে, সুতরাং জেলেদের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধান খুব কঠিন কিছু নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই মৎস্যখাত আমাদের জিডিপি’র ৩.৫৭% যোগান দিচ্ছে।