times

চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের পরিস্থিতি অনেকটাই সংকটাপন্ন। এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে আলোচনার জন্য আজ ১৬ মার্চ ২০১৫, সোমবার, জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে সকাল ১০:৫২ মিনিটে নিউজ ম্যাগাজিন টাইমওয়াচ এর উদ্যোগে ‘অর্থনীতিতে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব’ শীর্ষক এক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয় । উক্ত সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ, প্রেসিডেন্ট, এফবিসিসিআই। নওগাঁ চেম্বার অব কমার্স এবং রানার গ্রুপের পরিচালাকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন ড. মো. মজিবুর রহমান, সাবেক সচিব ও চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন আলমগীর শামসুল আলামীন, প্রেসিডেন্ট- রিহ্যাব; মো. জামিউল আহমেদ, চেয়ারম্যান- টিডাব; মাসুদ খান, আহবায়ক- বিডি সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন; মো. আলী জামান, প্রেসিডেন্ট- এসএমই ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন; মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বজলুর রায়হান, উপদেষ্টা সম্পাদক- টাইমওয়াচ।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই-এর সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ বলেন, আন্দোলন করেছি, রাস্তায় নেমেছি, আলোচনা করেছি। এমনকি বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গেও আলোচনা করেছি। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। তাই এখন বাংলাদেশের বড় জামাতের ইমাম (শোলাকিয়া) ফরিদ উদ্দীন মাসউদকে নিয়ে দোয়া দরুদ পড়ছি। আর কান্নাকাটি করছি। যারা বিভেদ সৃষ্টি করছেন, তাদের মনে আল্লাহ যেন রহম করেন।
তিনি বলেন, ‘জ্বালাও-পোড়াওয়ের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে সেটা আর ফিরে পাবো না। এ ৭০ দিনের হরতাল-অবরোধে মূল বাজেটের প্রায় অর্ধেকের বেশি পরিমাণ অর্থ ক্ষতি হয়ে গেছে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় সাড়ে তিন কোটি ব্যবসায়ী। তারা এখন মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। আর এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে পরিবহন খাত। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন, তারা কি সরকারের কোনো ক্ষতি করতে পেরেছেন? কিন্তু আমাদের অর্থনীতির ক্ষতি তো হয়ে গেছে। যে ক্ষতি হয়ে গেছে, তাতো আর ফিরে পাবো না। এ আন্দোলনটা তখনই হচ্ছে, যখন ২০২১ সালে দেশটা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। যখন দেশের অর্থনীতি মডেলে রুপান্তরিত হচ্ছিলো।
তার মতে, ক্ষতির বিষয়টি বেশি প্রচার করলে তারা (বোমা হামলাকারীরা) বেশি উৎসাহিত হবে। ধরেন, যে ছেলেটা বোমা মারছে, সে যদি জানে সাতটা লোক তার বোমায় মারা গেছেন, তাহলে সে উৎসাহিত হবে। আর যদি না জানে তাহলে সে আর উৎসাহিত হবে না। তাই ক্ষতির বিষয়টি জানানো যাবে না।
আমি বলবো, এখনো সময় আছে। বন্ধ করেন। জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন বন্ধ করেন। আগে আমি ওনাদের (বিএনপি) বলছি, জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ করেন। পরে আমরা অন্যদিকে (সরকারের কাছে) যাবো শান্তির জন্য। কিন্তু তা হলো না বলে মন্তব্য করেন কাজী আকরাম।
তিনি বলেন, নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। আর অন্য দলকে বলবো, সঠিক পথে আসেন। সরকারকে বলবো, সংলাপ বলেন আর যাই বলেন, দেশে শান্তি আনেন। বিরোধী জোটকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনারা এটাকে রাজনৈতিক আন্দোলন বলছেন। এখানে রাজনীতির তো কিছু দেখছি না। শুধু অর্থনীতির ধ্বংস দেখছি।
দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারলে দেশ দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই একটি চক্র অর্থনীতিকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। হরতাল-অবরোধে চলতি অর্থবছরের (২০১৪-১৫) বাজেটের অর্ধেকেরও বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে; যে ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলোকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, সংলাপ বলেন-আলোচনা বলেন; যাই হোক না কেনো দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনুন।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নেতাদের উদ্দেশ্য করে কাজী আকরাম বলেন, আগে সহিংসতা বন্ধ করুন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সংলাপে বসতে আমরা সরকারকে চাপ দেবো। তখন জোর গলায় সরকারকে বলতে পারব যে, এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে; তাই দেশ কীভাবে চলবে সে ব্যবস্থা করেন।
চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবহন খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে- উল্লেখ করে কাজী আকরাম বলেন, এ খাত যেন ভেঙ্গে পড়ে এবং মানুষ কোনোভাবেই যাতায়াত করতে না পারে তার জন্যই ট্রাকে আগুন দেওয়া হচ্ছে। প্রায় দুই মাস টানা অবরোধে যেসব মানুষ নিহত হয়েছেন; তাদের ৭৫ শতাংশই ট্রাক চালক।
মানববন্ধন, সমাবেশ, বিক্ষোভসহ নানা কর্মসূচি পালন করার পর ব্যবসায়ীরা আজ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে- একথা জানিয়ে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, আমরা আজ ভাগ্যাহত, আশাহত। আমরা ভেঙ্গে পড়েছি। সমাধানের কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছি না। তাই আজ আমরা কান্না শুরু করেছি।
আমি তো বুঝতে পারছি না, কী করবো। সবই তো করেছি। এখন কান্নাকাটি শুরু করেছি।
অযৌক্তিক কাজ করে যৌক্তিক সমাধান আশা করা যায় না। তবে কয়েকদিনে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। কিছুটা ভালো হয়েছে। আশা করি, আরো ভালো হবে বলেও মনে করেন এ ব্যবসায়ী নেতা।
সরকারের উদ্দেশ্যে  কাজী আকরাম বলেন, মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা দেয়া আপনাদের অতীব দায়িত্ব। তাই মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন। আর অন্যদের বলব আর ভোগাবেন না। রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করুন। সংলাপ ও সমাঝোতা যে ভাবেই হোক সংকট নিরসন করুন। তিনি অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করার আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা হরতাল অবরোধ বন্ধ করুন তাহলে আমরা সরকারকে চাপ দেব শান্তির পথে আসার জন্য।
সভাপতির বক্তব্যে নওগাঁ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আলী দ্বীন বলেন, ব্যবসায়ীরা সরকারকে বাঁচিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই ব্যবসায়ীরা আজ পথে বসেছে। তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থে আপনারা একটু নমনীয় হন, ছাড় দেন। তাহলে আপনাআপনি সমাধান হয়ে যাবে। আগামী ২৬ মার্চের আগে দেশের এ পরিস্থিতি সমাধান হওয়ারও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
পর্যটন ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জামিউল আহমেদ বলেন, এক সময় হয়তো আন্দোলন শেষ হবে। কিন্তু ট্যুরিজমের যে ক্ষতি হলো তা পূরণ হওয়ার নয়। অনেকে পথে বসে যাবে। আমাদের এখন গণকান্না কর্মসূচি দেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই।
বাংলাদেশ সিএনজি ওনার্স এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক মাসুদ খান বলেন, ব্যবসায়ীরা আতংকিত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া এর সমাধান হবেনা। তিনি সংলাপের মাধ্যমে সরকারকে সমাধানের উপায় বের করার আহবান জানিয়ে বলেন, দুই পক্ষকেই অনড় অবস্থা থেকে সরে এসে সহিংসতা বন্ধ ও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। নাহলে দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY