বছরের প্রথম দিন আজ রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নতুন বছরে বই বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে ।করোনা ভাইরাস পরিস্থিতির কারণে এ বছর বই উৎসব হয়নি। তবে শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে নতুন বই।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বই উৎসবের আমেজ না থাকলেও নতুন বই বিতরণ উপলক্ষে বই নিতে আসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছিল উচ্ছ্বাস। শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের ব্যস্ততার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নতুন বই পাওয়ার আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। এর আগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে নতুন বই পেতে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে বসানো হয়।
এবারের শিক্ষাবর্ষে ৪ কোটি ১৭ লাখ ২৬ হাজার ৮৫৬ জন শিক্ষার্থীর মাঝে ৩৪ কোটি ৭০ লাখ ২২ হাজার ১৩০ কপি পাঠ্যপুস্তক বিনামূল্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পদ্ধতিতে পাঠ্যপুস্তক ও ৫টি ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় মুদ্রিত পাঠ্যপুস্তকও রয়েছে। তবে, এ বছরের প্রথমদিনে সব শিক্ষার্থীকেই বই দেওয়া সম্ভব হয়নি। বই বিতরণ চলবে কয়েকদিন। পর্যায়ক্রমে নতুন বই পাবে শিক্ষার্থীরা।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী,ষষ্ঠ শ্রেণিতে ১ থেকে ৩ জানুয়ারি,সপ্তম শ্রেণিতে ৪ থেকে ৬ জানুয়ারি, অষ্টম শ্রেণিতে ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি এবং নবম শ্রেণিতে ১১ থেকে ১৩ জানুয়ারি বই বিতরণ করা হবে।
গত ৩০ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসএসসির ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরই ‘পাঠ্যপুস্তক বিতরন’ কার্যক্রম উদ্বোধন করেন।
এসময় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, নতুন বছরের ৯৫ শতাংশ বই প্রস্তুত হয়েছে। ইতোমধ্যে সেগুলো বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫ শতাংশ বই জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে স্কুলগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, মোট প্রায় ৩৮ কোটি বইয়ের মধ্যে মাধ্যমিকের ২১ কোটি বই মুদ্রণ ও বাঁধাই করা হয়েছে। বাকি ১৭ কোটির বেশি বই দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়েছে। অবশিষ্ট বই শিগগিরই স্কুল পর্যায়ে পাঠানো হবে।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, সারাদেশে প্রাথমিকের শতভাগ বই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌছে গেছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।
২০১২ সাল থেকে বর্তমান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বই বিতরণ উৎসবের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিচ্ছে। এই কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় সারাদেশে একযোগে বছরের প্রথম দিন ১ জানুয়ারি শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অভিভাবক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রাথমিক শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দফতরসমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারির উপস্থিতিতে উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে বই বিতরণ উদযাপিত হয়ে আসছে।
২০২২ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক স্তরে ৯ কোটি ৩০ লাখ ৩৪ হাজার ৩০টি, প্রাক-প্রাথমিক স্তরে ৬৬ লাখ ৫ হাজার ৪৮০টি, ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর জন্য ২ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৪ টিসহ মোট ৯ কোটি ৯৮ লাখ ৫৮ হাজার ৮৭৪টি বই শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হবে। প্রাক প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক-পঠন-পাঠন সামগ্রীর মধ্যে আমার বই এবং অনুশীলন খাতা বিতরণ করা হবে যথাক্রমে ৩৩ লাখ ২ হাজার ৭৪০টি।
অন্যদিকে জেলা-উপজেলা ও থানার জন্য ৫১২ টি উপজেলা ও থানায় বাংলা ভার্সানে এবং ৫৬টি জেলায় ইংরেজি ভার্সানের বই বরাদ্দ করা হবে। প্রথম শ্রেণিতে মোট ১ কোটি ২৪৯৬ হাজার ৪৯৪টি পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে বাংলা ভার্সানে ৫১২ টি উপজেলা ও থানায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৭৬ হাজার ৫৯৯টি, ইংরেজি ভার্সানে ৫৬ টি জেলায় ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৯৫টি বই বিতরণ করা হবে। দ্বিতীয় শ্রেণিতে মোট ১ কোটি ২১ লাখ ৪৩ হাজার ৩০৯ টির মধ্যে বাংলা ভার্সানে ১ কোটি ২০ লাখ ২৩ হাজার ৭৮০ এবং ইংরেজি ভার্সানে ১ লাখ ১৯ হাজার ৫২৯টি। তৃতীয় শ্রেণিতে মোট ২ কোটি ৩৬ লাখ ৫ হাজার ১৮৬ টির মধ্যে বাংলা ভার্সানে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৮ টি এবং ইংরেজি ভার্সানে ২লাখ ৫ হাজার ৮৩৮ টি। চতুর্থ শ্রেণিতে মোট ২ কোটি ২৯ লাখ ৪৫ হাজার ৯৯৭টি বইয়ের মধ্যে বাংলা ভার্সানে ২ কোটি ২৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৭টি এবং ইংরেজী ভার্সানে ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৩০টি বই বিতরণের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ২ কোটি ১০ লাখ ২৪ হাজার ৫২৩টির মধ্যে বাংলা ভার্সানে ২ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার ১৯৩ টি এবং ইংরেজি ভার্সানে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৩০ টি ।
এছাড়া ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য নিজস্ব বর্ণমালা সম্বলিত মাতৃভাষায় প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির পঠন-পাঠন সামগ্রী এবং প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই প্রণয়ন এবং সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২২ শিক্ষাবর্ষে ৫টি ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরী) শিশুদের মাঝে প্রাক-প্রাথমিক এবং প্রাথমিক পর্যায়ে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পাঠ্যপুস্তক বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, শেরপুর, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নঁওগা, নাটোর, সিরাজগঞ্জ, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, চাঁদপুর, ফেনী, কক্সবাজার, সুনামগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এই মোট ২০ টি জেলায় সরবরাহ করা হবে।
২০১০ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৪০০ কোটি ৫৪ লাখ ৬৭ হাজার ৯১১ কপি বই বিতরণ করা হয়েছে।